Saturday, 7 March 2020

শেষ চিঠি


শেষ চিঠি
-সুহাত



বেশ বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে,এবার যেনো চৈত্রের মাঝামাঝি তেই বৃষ্টি নেমে গেলো।চোখের চশমাটা গেঞ্জির নরম কাপড় দিয়ে মুছে নিচ্ছি,পরিষ্কার চোখে আজ একটি গল্প পড়ব!! দীর্ঘ ৪ মাস পর দুই দিন হলো বই পড়ছি।আসলে বই না ঠিক,কয়েকটা চিঠি!!! হুম,তাই বলাই বরং ভালো।আমার কাচা সবুজ বয়স টা নাকি খুব রোমান্টিক,মানে মা তো তাই বলেন।আর আমিও নিমাই এর "মেম সাহেব" ছাড়া আর কিছু পড়ি না।বইটা কিনেছি ২ দিন হইল,এর মধ্যে গোটা দুএক বার পড়া শেষ!!! মা আমার তার বড় এবং ভীষণ আশা ভরসার ছেলেকে "মেম সাহেব" পড়তে দেখেই আতকে উঠে! না জানি ছেলে আমার কোন ছলনায় ডুবল,কোন ললনায় মজলো।

তবে মা দেখি প্রেম করতে আমাকে মানা করেন না।খালি বলেন,প্রেম মাংসপেশী তে হয় না,হয় হৃদপেশী তে। দুটো পেশী কে কখনো গুলিয়ে ফেলো না।

সেই বৃষ্টির দুপুর টায় মেমসাহেব আর একবার রিভিশন দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছি,যদিও আসন্ন কলিযুগ এ এতো সুন্দর বই এতো বার পড়ে আমার কোন উপকার হবে না। তবুও নাদুস নুদুস নিশ্চিত সাফল্য এর মড়কে আগলানো ১০ সন্তান একত্রে গর্ভে লালন করা মোটা মোটা গাইড গুলো বাদ দিয়ে নিমাই এর কলম কে মনে মনে আউরাতে লাগলাম।হঠাত রুদ্রমূর্তি নিয়ে মায়ের আগমন-
 -এই সব বাদ দে। পরীক্ষার পড়া পর।
 -এহ,এই বইটা তুমি পড়ছ? জানো না কিছু!এতো সুন্দর বই আমি কখনো পড়িনি।নিজে পড়নি এখন আমাকেও পড়তে দিবা না!
 মা একটু চুপ হয়ে থাকল।আমি জানি মা এই বইটি অবশ্যই পড়েছে,তাও একটু শাসিয়ে ছিলাম।ভাবলাম কস্ট পেলো নাকি মা!
 -মা,কিছু বলবা?
 -হুম।
 -তো বল।
 মায়া ভরা দুটো চোখ নিয়ে আমার দিকে মা একবার তাকালো।তারপর বলল-
 "কাউকে পছন্দ করিস? মানে তোদের সাথে পড়ে এমন কোন মেয়েকে?
 -হুম,করি।
 -নাম টা বলে ফেলো শুনি।
 -রিধিতা।
 -কেনো পছন্দ কর ওকে? মানে ওর কোন গুনটা তোমাকে মুগ্ধ করেছে?
 অনেক ভেবে চিনতে বললাম,"ও অনেক সুন্দর দেখতে"
 আম্মু আবার সেই পুরান ঘেন ঘেন শুরু করল,বলল-

প্রেম মাংসপেশী তে হয় না,হয় হৃদপেশী তে। দুটো পেশী কে কখনো গুলিয়ে ফেলো না।

ধুর,এক কথা আর কয়বার শুনব!একটা ঝারি দিবো কেবল,অমনি আম্মু ২টা চিঠি আর একটা কাগজ।অনেক পুরাতন লেখা গুলো মনে হচ্ছে।তা কম হলেও বছর ১৫ আগের তো হবেই।

-নে ধর,এইগুলা পড়।
 -আচ্ছা,লেখা পড়তে আমার দোষ নাই।কিন্তু কার লেখা তা তো বলবা??
 -আমি নিজেও জানি না! বা জানলেও বলা যাবে না!
 আমার তো মেজায অনেক গরম হল।" কে লিখছে তা বলতে কি সমস্যা?"
 -১ম চিঠি টার মানুষ টাকে আমি ই চিনি না।উনিই লিখসেন। ২য় টি আমার অফিস এর এক কর্মচারী খুব যত্ন করে গুছিয়ে গুছিয়ে লিখেছেন।২টা চিঠি একি খাম এ....
 ব্যাপার টাতে ইন্টারেস্ট পাচ্ছি,দেখি কি লিখেছেন উনি।
 এইদিক এ মা চা বানাতে চলে গেছে,হাল্কা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর গরম চা! চিন্তা করলেই প্রেমবিরহের কিছু পড়তে মন চায়।
 যাই হোক,এসব ভাবতে ভাবতেই চিঠিটা পড়া শুরু করলাম। ১ম চিঠি টা দিয়েই শুরু করি...

"প্রিয় সুনিতী,
 তোমাকে ভালবাসি না,ঘৃনাও করি না।পেতেও চাই না,হারাতেও চাই না।আমি তোমার প্রেমে পরিনি,কিন্তু আমার চোখের নোনতা পানি কিছুটা পরেছে।বাদ দেই সেসব কথা।এই চিঠি তে আমার চোখের সেই বিবেক বুদ্ধিহীন জল গুলোর আত্মজীবনী লিখে যাব।
 শরতের সাতে সাদা শাড়ী তে সামনের বাসার বারান্দায় তোমায় প্রথম দেখেছিলাম।এমন না যে দেখেই চার হাত পা শিকয় তুলে ধপ করে তোমার প্রেমে পড়ে গেছি। ৯০'এর অত্যাধুনিক যুগে মানুষ দেখি এভাবেই যেখানে সেখানে প্রেমে আছাড় খাচ্ছে! আমি তাদের দলগত নই।
 তবে প্রথম দেখায় খারাপ ও লাগেনি।শ্যামলা মায়াময়ী মুখের কথা বর্ণনা করে চিঠি টা আর বড় করব না।

না চাইতেই তোমার চাচা এর কর্কশ কন্ঠে তোমার নামের আস্ফালন এ ঘুম ভাংত রোজ।না,সেটা আমার মোটেই কামনীয় ছিলো না।সে এক ভয়াবহ চিতকার।গগন বিদারী টেবিলঘড়ি এর এলার্ম ও তার কাছে নিতান্তই তুচ্ছ।অতপর হৃদস্পন্দন কে দেড় গুন বাড়িয়ে লাফিয়ে উঠতাম ঘুম দিয়ে।ঠোট জোড়া থেকে অজান্তেই তোমার জন্য দুই একটা গালাগাল বেড়িয়ে আসত।এভাবেই অপরিচিত নামটা আমার অতিপরিচিত হয়ে উঠল।সুনিতী,সুনিতী দাস। প্রায়ই দেখতাম কাপড় মেলতে ছাদ এ আসতে,বারান্দার গ্রিল পরিষ্কার করতে,পাড়ার দোকান থেকে অল্প পয়সার কিছু জিনিস পত্র ও কিনতে।এভাবেই একদিন আমার আর তোমার দুই জোড়া চোখের সাক্ষাত হয়েই গেলো। না,আমি সুন্দর এর পুজারী নই,তাই তোমার সৌন্দর্য আমি খুব বুঝিনি।তবে ওইদিন তোমার দুনিয়াটা কিছুটা বুঝেছিলাম। মনে পড়ে? ওইদিন তুমি আমায় বলেছিলে,তুমি আশ্রিতা,তুমি পিতা হারানো এক এতিম,তুমি সম্বলহীনা এক মায়ের শেষ সম্বল।তারপর আমার তোমার দেখা হতো প্রায়ই,শুধু কাকতালীয় থেকে ব্যাপারটা ইচ্ছাকৃত হতে থাকল।তোমাকে নামতে দেখেই আমিও নেমে যেতাম আনমনেই। কিছু কথা বলে রাখা দরকার তো,নয়তো তুমি বুঝবে কি করে? আমার আব্বুর অনেক টাকা।অনেক না হলেও আমাদের নিজেদের বাড়ি আছে,ছোট একটা গাড়ি ও আছে।মোট কথা অর্থাভাব নেই একেবারেই।বাবা আমার সরকারি বড় চাকরি করেন,সামাজিক অবস্থান ও তাই বেশ উচ্চ।এমন পরিবারের ছেলে আমি।বুঝলে,কত ভালো পরিবার? আমি উচ্চ তুমি নীচ,আমার জামা দামি তোমার টা ফুটো,আমার রক্ত মুসলিম তোমার রক্ত হিন্দু।আমি নিলয়,তুমি সুনীতি।" হটাত মা চায়ের কাপ টা ঠুং করে সামনে রাখল।মনোযোগ হারিয়ে গেলো।মা কে বললাম, লেখাটা খারাপ না। -পুরাটা পড়েছিস? -না। -আগে পড়া শেষ কর। চায়ে চুমুক দিতে দিতে আবার চিঠিটা পড়া শুরু করলাম। "আমি সবে একুশে পা দিয়েছি।জীবন ঘড়ি টা কুড়িবার ঘুরেছে।মাথার উপরে দেখি বড় বড় ঝাড়বাতি গুলোও ঘুরছে।চারিদিকে সব দামি দামি বস্তু বাস্তুতে বাতাসের অক্সিজেন টাকেই খুব সস্তা লাগছিল তখন।সবাই আমাকে কতো উপহার দিল।আমার সদ্য যৌবন ঘেসা মনটাও কেমন যেন বেশ আনন্দে ভড়ে যাচ্ছিল সেদিন।

না,সেদিন হয়ত একবারের জন্যেও তোমাকে মনে পড়ত না।যদি না তোমার চাচার পশুত্বটা মনুষ্যত্বটাকে আড়াল না করত।ধুপ ধাপ করে কৈশোর যৌবনের মাঝে দাঁড়ানো একটি মেয়েকে এভাবে মাড় খেতে আমি দেখি নি,কখনো দেখিনি।খুব কষ্ট হয়েছিল সেদিন।আমার উতলতা দেখে বাবা বললেন,আরে এই পাশের বিল্ডিং টাতে কতোগুলা মূর্খ আসছে।বস্তির মতো মারামারি করে। না,আমিও সেদিন তোমার জন্য চোখের পানি ফেলিনি।বরং একদমে মোমবাতি টাকে নিভিয়ে দিয়ে উতসব করেছি নতুন আধুনিক মনুষ্য কে মাথায় তুলে।তবে হ্যা,তোমার প্রতি আমার দয়া ছিল।এটার কোন কমতি ছিল না। এভাবে সব যাচ্ছিল ভালই।এই এলাকাতে থাকা স্বরুপ আমার স্থানীয় কিছু বন্ধুও হয়েছে।পরিচিত সমবয়সী ছেলে বলা চলে,ঠিক বন্ধু নয়।এর মধ্যে কিরণ নামের একটা ছেলে ছিল।ওকে তুমিই আমার থেকে ভালো চেনো।কেন চেন তা লেখার সাধ্যি আমার কলম এর নেই।যাই হোক,ওদের সাথে আমার ও হাল্কা হাল্কা কথা বার্তা হতো। এরপর হঠাত সেই দিন।কোন দিন বুঝেছো তো? ওই যে বৃষ্টি হচ্ছিল।আমি আমার চার তলার সুউচ্চ ভবনে বসে তোমাকে দেখছিলাম।জলে কাপড়ে এক হয়ে যাওয়া তোমার শরীরের দিকে আমি একবারো তাকাইনি,বিশ্বাস করো।আমি শুধু তোমার লাল চুড়ি গুলোর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।খুব সুন্দর ছিল সস্তাদর এর চুড়িগুলো। কিন্তু আমি তাকাইনি তাতে কি?জগতে হাজার হাজার কুকুরে চোখ বড় বড় করে তোমার দিকে তাকিয়ে ছিলো।কেন জানি মন চাচ্ছিল ওদের সবার চোখে আগুন দিয়ে দেই। হঠাত সেই কিরণ এর আগমন,সাথে সেই অসহনীয় আচরণ। মাথা ঠিক রাখতে না পেড়ে হন হন করে নিচে চলে গেলাম।অজান্তেই কিরণ এর সাথে ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছিলাম সেদিন।একপর্যায় এ হাতাহাতি পর্যন্ত চলে গেল ব্যাপারটা।এলাকার সবাই দেখল।শুধু দেখল। কিরণ চলে গেল,আর বলে গেল,"ঐ মেয়েকে আমি খবরের পাতার শিরোনাম করে দেব!"। তোমার সাথে আমার শেষ কথা হয়েছিল ঐদিন ই।বলেছিলে,"এগুলো করেন আবেগে,ঐ দেখেন,কত মানুষ পুরা ঘটনা দেখেছে। ওদের মতো হতে শিখুন। চোখ মুছতে মুছতে সেইদিন তুমি চলে গিয়েছিলে।শুধু কিরনের তালুতে পিস্ট সাদা ওড়না আর তোমার হাতের ৩ টা লাল চুড়ি পরেছিল কনক্রিট এর ঐ রাস্তায়।আমার কনক্রিটের এই মনেও অনেকগুলো কথা সেদিন জমে গিয়েছিল;যা তোমার আর শুনবার সময় হয় নি। সেদিন থেকেই আমার মনে,আমার চোখে,আমার ভাবনায় তোমাকে নিয়ে বেশ একটা আতংক ছিলো।না জানি ঐ জানোয়ার টা কবে কি করে বসে। ২৩শে মার্চ,১৯৮৯। সকাল ৫:৪৫(আনুমানিক) ঘুম থেকে চোখ মুছতে মুছতে উঠলাম।কি ব্যাপার? তোমার চাচার গগন বিদারী চিতকার টা নেই কেন? "সুনিতী,সুনিতী উঠ হারামী" কথাটা নেই কেন আজ? তোমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাটায় দেখি বেশ ভিড় জমেছে।কোন রকম একটা জামা গায়ে দিয়ে দিলাম দৌড়। তারপর এ যা দেখলাম,যা শুনলাম তা যেন আমার মনের মলাট টাকে চিরচির করে ছিড়ে দিল।না,সুনিতী বেচে আছে।ও মরেনি।কিরন ওকে মারেনি।ওর হৃদস্পন্দন চলছে।থেকে হাত পা নড়ছে।শুধু আমার সুনিতীর দেহের নিম্নাংশ টা রকে ভিজে আছে।আমার হাত পা গুলো হঠাত বোবা হয়ে গিয়েছিল।আমার মস্তিষ্ক নিথর হয়ে গিয়েছিল।আমার দুনিয়াটা অন্ধ হয়ে আসছিল।কিছু বুঝে উঠবার আগেই বুঝলাম তোমাকে তোমার চাচা তাড়াতাড়ি হাসপাতাল এ নিয়ে যাচ্ছে।না না,তোমাকে ভালবেসে না,তোমার দেয়া লাল রক্তের লজ্জা ঢাকতে।না না,তোমার লজ্জা নয়,তোমার চাচার লজ্জার কথা বলছি। আমিও গেলাম তাদের সাথে,লজ্জা ঢাকতে হবে যে।সমাজের লজ্জা,শহরের লজ্জা,দেশের লজ্জা.... রক্তমাখা হাত আর আমার বোবা হাতজোড়ার প্রথম ও একমাত্র মিলন হয়ে গেল এই লজ্জা ঢাকবার ছলেই।আমি বুঝলাম,আমি অসহায়। কোন রকম এর সরকারি হাসপাতাল এ তোমাকে নিয়ে ডাক্তার পর্যন্ত পৌছে দিয়েই তোমার চাচা পরিবার সমেত এলাকা ছেড়ে চলে গেলেন।রেখে গেলেন তার বিদীর্ণ চিতকারে তোমার নামটা শুনবার প্রিয় বিরক্তিকর স্মৃতি গুলো। ঘন্টা দুয়েক পরে ডাক্তার যখন একটু সুযোগ পেলেন,আমি হুট করে বলে বসলাম এই পেসেন্ট এর কি অবস্তা? "খুবি খারাপ।উন্নত চিকিৎসা দিলে বাচলেও বাচতে পারে।" আমি জানি আমি অসহায়।আমার নিজের কোন অর্থ নেই তোমাকে বাচানোর।সামর্থ্য নেই তা জোগাড় করে তোমাকে জাগাতে।সাহস নেই জড়িয়ে ধরে তোমাকে বলতে,সুনিতী,তুমি আমার। ধীরে ধীরে ক্ষীন হয়ে আসছে দিনের আলো।দ্রুত কমে আসছে তোমার ফেরার সম্ভাবনা। রাত ৮:৩০ এর দিকে ডাক্তার আমাকে ডাকলেন।আমার মনটা হঠাত লাফিয়ে উঠল।মনে হচ্ছিল ডাক্তার বলবেন,উনি আপনাকে খুজছেন।আবার তোমাকে চিরতরে হারানোর ভয় ও ছিল আমার চোখ জুড়ে।ভাবতে ভাবতেই দৌড়ে চলে গেলাম ডাক্তার এর কাছে। ডাক্তার বলল,"শুনুন,উনার আর বাচবার তেমন কোন সুযোগ নেই।যে কোন সময়েই একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে।আপনি যদি পারেন লাশ নেবার একটা ব্যাবস্তা করেন।রেপড কেস,যত তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবেন ততই ভালো"। ডাক্তার চলে গেল এ কথা বলেই।স্বপ্ন গুলো সাথে সাথে ভিজে গেল অশ্রুতে। নিথর দেহে তোমার মুখটার কথা মনের দেয়ালে মিশিয়ে দিতে দিতে বাড়ি ফিরলাম। ওমা,বাসায় ফিরে দেখি লজ্জায় আমার বাবার কচু কাটার মত অবস্থা।সে কি লজ্জা সে কি লজ্জা!!! "নিলয়,তুমি এরকম কাজ করলে কিভাবে।সবাই কি বলল জানো?তুমি নাকি ওই মেয়েটাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছো? এরপর পুলিশি ঝামেলা আছে,রেপ কেস এইটা।বুঝো কিছু? তুমি আমার ছেলে,এইসব থার্ড ক্লাস মেয়েদের এক জীবনে ২-৪ বার এমন হয়েই থাকে।কিন্তু একবার যদি এই রেপ ইস্যু তে তোমার নাম কোথাও আসে? তখন তুমি কি করবা??" আরো জানি কি কি বলছিল বাবা।আমার কান জোড়া তা শুনবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। আমি নিজের রুম এ চলে আসলাম।একটা কাগজ নিলাম,আর একটা ইকোনো ডি এক্স বল পেন।তারপর আবেগ গুলো কে তোমার বোধগম্যতার আওতায় আনলাম।জানি তুমি এই চিঠিটা পড়তে পাড়বে না।তবুও লিখে তো দিলাম,"আমার আকাশটা শুধুই তোমার।আমার হৃদয় এর মালিক শুধুই আমি।আমার এই হৃদয় এর প্রতিটা কনা শুধুই তোমার।আমার প্রতিটা রক্তকোষ এ তুমি মিশে গেছ।হয়ত আমি আজ নিশ্চিত,এগুলো কোন ধর্ষিত যুবতীর প্রতি আমার দয়া নয়।এগুলো কোন অসহায় এর প্রতি আমার আফসোস নয়।এগুলো তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা। হ্যা সুনিতী,যদি কখনো এই চিঠিটা তোমার পড়ার ভাগ্য হয়,তবে জেনে রেখ,আমি তোমাকে ভালোবাসি।খুব বেশী ভালোবাসি।আমি তোমার জন্য পরকালে অপেক্ষা করব,ওই যে,তোমার ছেড়া সাদা ওড়না আর তিনটা লাল চুড়ি,ওগুলো আমি হাতে নিয়ে থাকব যেন তুমি আমার থেঁতলে যাওয়া চেহারাটা চিনতে পারো।

শুভকামনা।
 নিলয়।"
 একটা স্বপ্নের মধ্যে যাচ্ছি মনে হলো।হতচকিয়ে উঠলাম।চায়ের কাপের চা টা হিম শীতল হয়ে গেছে।বাইরের বৃষ্টি টা বেড়েছে।মা আমার বাইরে গেছেন কোন ব্যাংক এর টাকা তুলতে।ছাতা মাথায় অনেক গুলো লোক দৌড় দিচ্ছে বাড়ির দিকে।আচ্ছা,ভালো কথা! আর একটা চিঠি তো বাকি! তাড়াতাড়ি চিঠিটা বের করে পড়তে বসলাম।আগ্রহ যেন আমার আবেগকে উপচিয়ে ফেলছে।
 "প্রিয় পাঠক,
 ১ম চিঠি টা আগে পড়ে এই চিঠিতে আসবেন।
 নিলয় সেদিন রাতে আর দরজা খুলে নি।পরদিন নিলয় কে পাওয়া যায়।তাদের চারতলা বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়েছিলো সে।হয়ত আত্মসম্মান এর তাগিদে,হয়ত বিবেকের তাড়নায়,হয়ত উদ্বায়ী আবেগে,হয়ত নগ্ন নিঠুর বর্তমান কে মেনে নিতে না পেড়ে সে আত্মহনন করে ছিল।
 আর সুনিতী?
 মানবাধিকার কর্মী দের নজরে আসে সুনিতী।২৪ তারিখে তাকে উন্নত ট্রিটমেন্ট এর জন্য ভারত এ নিয়ে যাওয়া হয়।দীর্ঘ ১ ১/২ মাসের চেষ্টায় মোটামুটি সুস্থ হয়ে ওঠে সে।
 দেশে ফিরলে নিলয় এর মা চিঠিটা সুনিতীর কাছে পৌছে দেয়,আরো দিয়েছিল সেই ছেড়া ওড়না আর তিনটা লাল চুড়ি।এই জিনিস গুলো সাথে নিয়েই যে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে মরে ছিল নিলয়।
 আজ ১১ই ফেব্রুয়ারি ২০১৪।
 সুনিতী মানবাধিকার কর্মিদের সহয়তায় উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তি হন ইংরেজি বিভাগ এ।তিনি এখন দেশের একটি সুনাম ধন্য company তে CEO পদে নিযুক্ত।তিনি খুব গম্ভীর একজন মহিলা। চল্লিশোর্ধ বয়সের এই নারী এখনো বিয়ে করেন নি। ১ম চিঠিটা তার চিঠিটির ফোটকপি।নিলয় এর মায়ের কাছ থেকে পাওয়া।হয়ত সুনিতী দাস ও অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে পরকালের,নিলয় তো তাকে কথা দিয়েছে,ঐ লাল চুড়ি,সাদা ওড়না নিয়ে অপেক্ষায় থাকবে।
 হয়ত সুনিতী প্রতি রাতেই ঘুম ঘুম চোখে নির্ঘুম ঠোটে বলে ওঠে,"আমি আসব নিলয়,আর মাত্র কটা দিন।"

চিঠি টা পড়া শেষ।কেমন যেন নিশ্বাস গুলো একটু দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে।বৃষ্টি থেমে এসেছে।আকাশ পরিষ্কার ও হচ্ছে ধীরে ধীরে।আমার অনেক অনুভুতি,ধারনে,চিন্তাধারাও পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
 মনে পড়ছে মা এর সেই কথা গুলো,
 "ভালোবাসা মাংসপেশি তে হয় না,ভালোবাসা হয় হৃদপেশী তে"

নাহ,ভালোবাসার সংগা টা নতুন করে বুঝতে হবে।আর রিধিতা কে বলতে হবে,আমি তোমায় ভালোবাসি না।নিলয় এর মতো ভালোবাসা ওলিতে গলিতে জন্মায় না।

বৃষ্টি থেমে গেছে,নতুন বিবেক গুলো আবেগ গুলোকে ধরতে শিখেছে।
 ভালো থেকো নিলয়,ভালো থেকো সুনিতী।

Labels:

0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home